তথ্য উদঘাটন: মোঃ খায়রুল আলম রফিক ০২/৬/২৬
রাজধানীর পল্লবীতে এক বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু ঘিরে যে খবরটি সামনে এসেছে, তা সত্যিই হৃদয়বিদারক। প্রায় এক সপ্তাহ আগে মারা যাওয়া ৭২ বছর বয়সী ওই মায়ের গলিত দেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নিহত বৃদ্ধার তিন সন্তানই সমাজের উচ্চপদস্থ ও শিক্ষিত মানুষ। একজন মংলা বন্দরের সচিব, একজন বুয়েটের অধ্যাপক, আরেকজন কানাডাপ্রবাসী। বৃদ্ধা নিজে মেয়ের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকতেন। মেয়ে থাকতেন এক রুমে, আর মা পাশের রুমে। মেয়ের জামাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। অর্থাৎ, পরিবারটি শিক্ষা ও অবস্থানের দিক থেকে কোনোভাবেই সাধারণ নয়।
তবুও সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো, মা মারা যাওয়ার পরও প্রায় এক সপ্তাহ কেউ তা জানতে পারেনি। একই ফ্ল্যাটে, পাশের রুমে থেকেও মেয়ের চোখে পড়েনি মায়ের নিথর দেহের নিস্তব্ধতা। শেষ পর্যন্ত “মা সাড়া দিচ্ছেন না” এই অজুহাতে নার্স ডেকে আনার পরই প্রকাশ পায় ভয়াবহ সত্য।
একটি মানুষের দেহ এক সপ্তাহ ধরে পচতে থাকলেও যদি সন্তানরা তা টের না পায়, তবে সেই সম্পর্কের শূন্যতা আর অবহেলা কতটা গভীর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বছরের অন্য কোনো সময়ে এমন ঘটনা ঘটলে হয়তো কেউ কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দাঁড় করাতেন। কারণ সচিব কিংবা বুয়েট অধ্যাপকের পদগুলো ভীষণ দায়িত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততায় ভরা। কিন্তু এবার তো ঘটনা ঘটেছে ঈদের ছুটির মধ্যে। এত লম্বা ছুটিতেও কি তিন সন্তানের একজনও বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না?
একটি ফোন, একটি দেখা, একটি খোঁজ এতটুকু টানও কি জাগল না?
একজন সন্তানকে সমাজের এমন এলিট প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে একজন মায়ের যে কতটা ত্যাগ আর কষ্ট করতে হয়, তা আমরা সবাই জানি।
অথচ সেই মায়ের শেষ বয়সে এসে যদি তিনি এমন নিঃসঙ্গতা আর অবহেলার শিকার হন, তাহলে তা শুধু দুঃখজনক নয়, লজ্জারও।
কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো— মা তার সন্তানদের যে পরিমাণ উচ্চশিক্ষিত বানাতে পেরেছেন, তার ছিটেফোঁটা পরিমাণ মনুষ্যত্ব হয়তো দিতে পারেননি। আর এই চরম অকৃতজ্ঞতার চর্চাটুকুই আমাদের সমাজে এখন অবলীলায় ঘটে চলেছে।
আজ আমরা এতটাই ব্যস্ত, এতটাই আধুনিক, এতটাই নিজের পৃথিবীতে বন্দী যে বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার মতো সময়ও যেন আর আমাদের নেই।
মনস্থির করে চিন্তা করে দেখলে কী অদ্ভুত, তাই না? সন্তানদের এত বড় বড় ডিগ্রি, এত এত টাকা, সমাজে এত এত সম্মান! কিন্তু যে মা তাদের এই সাফল্যের চূড়ায় বসিয়েছিলেন, সেই মায়ের ভাগ্যে শেষ বয়সে জুটল একটা অপরিচ্ছন্ন, ময়লা-আবর্জনা আর অবহেলায় ভরা অন্ধকার ঘর।
অথচ আমরা ভুলে যাই, এই দুনিয়াও একদিন ছেড়ে যেতে হবে। আর তখন সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে থাকবে এই মা-বাবাই।
আর ফেসবুকে স্ক্রল করলেই আমরা দেখি, সবাই কত আদর্শ সন্তান, কত পারিবারিক সুখের ছবি। কিন্তু এই ঝলমলে পর্দার আড়ালে নুরজাহান বেগমদের মতো কত মা-বাবা যে জীবন্ত লাশ হয়ে ঘরের কোণে পড়ে আছেন, তার হিসাব কে রাখে?
আসুন, অন্তত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিই। মা-বাবার পাশে বসি, তাদের খোঁজ নিই, কথা বলি, সময় দিই। কারণ দিনশেষে তাঁরাই আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে আপন ঠিকানা।